বাংলাদেশে শিশুশ্রম একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা, যা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিকাশে বড় বাধা সৃষ্টি করছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সারাদেশে প্রায় ১৭ লাখ শিশু বিভিন্ন শ্রমে নিয়োজিত রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগ শিশুশ্রমের দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান করছে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলের জন্য এক গভীর চিন্তার বিষয়। এই পরিসংখ্যান দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বল দিকগুলো উন্মোচন করছে এবং শিশুদের অধিকার সুরক্ষায় আরও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, শিশুশ্রম হলো এমন কোনো কাজ যা শিশুর মানসিক, শারীরিক, সামাজিক, নৈতিক বা আত্মিক বিকাশের জন্য ক্ষতিকর এবং যা তাদের শিক্ষাবঞ্চিত করে। বাংলাদেশে দারিদ্র্য, শিক্ষার অভাব, অসচেতনতা এবং অর্থনৈতিক চাপই মূলত শিশুদের শ্রমবাজারে ঠেলে দিচ্ছে। অনেক পরিবারে শিশুদের আয় পরিবারের ভরণপোষণের জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে তারা অল্প বয়সেই উপার্জনের পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। এটি শুধুমাত্র শিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত করে না, বরং তাদের স্বাভাবিক শৈশবকেও কেড়ে নেয়।
এই ১৭ লাখ শিশুর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে জড়িত। কৃষি, গৃহস্থালি কাজ, নির্মাণ শিল্প, পরিবহন খাত, ছোট কারখানা, ওয়েল্ডিং, গ্যারেজ এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র শিল্পে শিশুদের দেখা যায়। বিশেষ করে চট্টগ্রাম একটি শিল্প ও বন্দরনগরী হওয়ায় এখানে কলকারখানা, জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং পরিবহন খাতে শিশুদের শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। এসব কাজ শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা প্রায়শই অপুষ্টি, রোগব্যাধি এবং দুর্ঘটনার শিকার হয়, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন করে।
বাংলাদেশ সরকার শিশুশ্রম নিরসনে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। ‘জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি-২০১০’ এবং ‘ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন প্রকল্প’ সহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশকে শিশুশ্রমমুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG)-এর একটি অংশ। তবে আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, তদারকির অভাব এবং সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি এই লক্ষ্য পূরণে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অনেক ক্ষেত্রে, আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে বা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কারণে শিশুশ্রম বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
শিশুশ্রমের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ। এটি শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করে, তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনেও দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র থেকে বেরিয়ে আসতে বাধা দেয়। এই সমস্যা সমাধানে সমন্বিত পদক্ষেপ অপরিহার্য। শিশুদের জন্য মানসম্মত ও সহজলভ্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা, দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির প্রসার ঘটানো, অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কঠোর তদারকি জরুরি। একই সাথে, বেসরকারি সংস্থা ও সুশীল সমাজের অংশগ্রহণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যারা মাঠ পর্যায়ে কাজ করে শিশুদের শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে পারে।
দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে শিশুদের সুরক্ষা ও বিকাশে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ১৭ লাখ শিশুর শ্রম থেকে মুক্তি এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের নৈতিক কর্তব্য। শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টা একান্ত কাম্য, যাতে প্রতিটি শিশু তার অধিকার নিয়ে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে