নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতিকে নিছকই ‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। আজ সোমবার সকালে ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পাটকল চালুর দাবিতে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভায় তিনি এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন। ‘রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা পরিষদ’–এর ব্যানারে আয়োজিত এই সভায় দেশের শিল্পনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর সমালোচনা উঠে আসে।
অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ তাঁর বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের আগে যেসব ইশতেহার প্রকাশ করে এবং তাতে যেসব অঙ্গীকার করে, সেগুলোকে তারা নিজেরাই গুরুত্ব দেয় না। তাঁর মতে, ‘নির্বাচনী ইশতেহারের এসব প্রতিশ্রুতির কথা বললে দলগুলো হয়তো হাসবে, কারণ এটি তাদের বহুদিনের অভ্যাস। এই ধোঁকাবাজি তাদের রাজনীতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য ও বিভেদ থাকলেও, রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বন্ধ করা বা সেগুলোকে বেসরকারীকরণ করার মতো মৌলিক নীতিগুলোতে তাদের মধ্যে প্রায়শই কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। নির্বাচনের প্রাক্কালে তারা এ ধরনের বন্ধ শিল্প পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যে তা সম্ভব নয়, তা দলগুলোও ভালো করেই জানে।
আনু মুহাম্মদ বলেন, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সম্পদ ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের এই প্রক্রিয়া বাংলাদেশে আশির দশক থেকে চলে আসছে এবং এর পেছনে একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বারবার কাজ করছে। এই কাঠামোর মূল স্তম্ভ হলো আন্তর্জাতিক সংস্থা, দেশের আমলাতন্ত্র এবং বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী। এই প্রভাবশালী মহলগুলোই মূলত দেশের শিল্প ও অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করে থাকে। তাঁর ভাষায়, নীতি প্রণয়নকারীদের চেহারার কোনো পরিবর্তন হয় না, পরিবর্তন হয় কেবল সেসব নীতি বাস্তবায়নকারীদের। এ কারণেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতার মসনদে এলেও রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পুনরায় চালুর প্রতিশ্রুতি আলোর মুখ দেখে না এবং একই ধরনের অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়িত হতে থাকে। এটি কেবল পাটকল নয়, অন্যান্য রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
পাটকলশ্রমিকদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বেসরকারীকরণের প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাজার হাজার পাটকলশ্রমিক। তাঁদের ন্যায্য মজুরি ও পাওনা পরিশোধ করা কঠিন কোনো বিষয় ছিল না, অথচ তা পরিশোধ করা হয়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, পাটকল বেসরকারীকরণের পক্ষে যেসব যুক্তি দেওয়া হয়—যেমন পাটের চাহিদা নেই, লোকসান হচ্ছে বা পাটকল চালানো সম্ভব হচ্ছে না—সেগুলো নিছকই ‘প্রতারণা ও মিথ্যাচার’। তিনি মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পাটশিল্পকে লাভজনক করা সম্ভব।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিষয়ক গবেষক মাহা মির্জা অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত পোষণ করে বলেন, শ্রমিক, কর্মসংস্থান এবং দেশীয় শিল্প রক্ষা—এই বিষয়গুলোতে সব সরকারই প্রায় একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। তারা মুখে উন্নয়নের বড় বড় কথা বললেও, শ্রমিকের স্বার্থের ক্ষেত্রে তাদের চিন্তাচেতনা একই থাকে। সরকারগুলো কখনো শ্রমিকের দৃষ্টিকোণ থেকে অর্থনীতিকে দেখে না, বরং তাদের পুরো মনোযোগ থাকে ব্যবসায়ী দৃষ্টিকোণ থেকে। মাহা মির্জা বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুয়াল’ শ্রমনির্ভর দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এদেশের সবাইকে প্রকৌশলী বা কম্পিউটার বিজ্ঞানী বানানো সম্ভব নয়। কোটি কোটি শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কথা মাথায় রেখেই শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে এবং এটি সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
সভায় উপস্থিত বক্তারা সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পুনরায় চালু করা এবং দেশের শিল্পনীতিতে শ্রমিক ও দেশীয় শিল্পের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশনের সভাপতি জহিরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এবং জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি ফয়জুল হাকিম লালা। তাঁরা দেশের ঐতিহ্যবাহী পাটশিল্পকে রক্ষা এবং শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান। এই সভা দেশের শিল্পনীতি ও শ্রমিক অধিকার নিয়ে এক নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে