কিংবদন্তি পাপেটম্যান মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ: শিল্প ও শিক্ষাজগতে অপূরণীয় ক্ষতি

কিংবদন্তি পাপেটম্যান মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ: শিল্প ও শিক্ষাজগতে অপূরণীয় ক্ষতি

বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও শিল্পাঙ্গনের এক প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, প্রখ্যাত শিল্পী, শিক্ষাবিদ এবং ‘পাপেটম্যান’ খ্যাত মুস্তাফা মনোয়ার গতকাল ২৯ জুন, শুক্রবার সকালে ৯০ বছর বয়সে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তার প্রয়াণে দেশের শিল্পকলা, বিশেষত পুতুলনাট্য ও শিশুশিক্ষার জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের কর্মময় জীবনে তিনি তার বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং দেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এক গভীর প্রভাব ফেলে গেছেন।

মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম ১৯৩৪ সালের ১লা সেপ্টেম্বর মাগুরায়। তার বাবা ছিলেন বরেণ্য শিল্পী কামরুল হাসান। বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে তিনিও শিল্পকলার প্রতি অনুরক্ত হন এবং ঢাকা আর্ট কলেজ (বর্তমান চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে চিত্রকলায় উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। তার সৃজনশীলতার ব্যাপ্তি ছিল বিশাল; তিনি একাধারে চিত্রশিল্পী, নির্দেশক, উপস্থাপক, শিক্ষক এবং সর্বোপরি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) তার কর্মজীবন শুরু হয় এবং সেখানেই তিনি তার অনন্য প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।

পুতুলনাট্যকে তিনি বাংলাদেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছেন, যে কারণে তিনি ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ উপাধিতে ভূষিত হন। বিটিভিতে প্রচারিত তার জনপ্রিয় পুতুলনাট্য অনুষ্ঠান ‘এসো শিখি’, ‘মনের কথা’ এবং ‘আদর্শ লিপি’ শিশুদের শিক্ষায় ও বিনোদনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। তিনি পুতুলকে কেবল খেলার উপকরণ হিসেবে দেখেননি, বরং সেগুলোকে শিক্ষাদানের এক শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তার হাতে গড়া পুতুলগুলো জীবন্ত হয়ে উঠতো এবং জটিল বিষয়গুলোকেও সহজ ও আনন্দদায়কভাবে উপস্থাপন করতো, যা শিশুদের মনে গভীর রেখাপাত করতো। তার এই উদ্ভাবনী পদ্ধতি শিশুদের শেখার আগ্রহকে বহুলাংশে বাড়িয়ে তুলেছিল।

পুতুলনাট্য ছাড়াও মুস্তাফা মনোয়ার চিত্রশিল্পী হিসেবেও অত্যন্ত সুপরিচিত ছিলেন। তার চিত্রকর্মগুলোতে বাংলাদেশের প্রকৃতি, জনজীবন এবং সংস্কৃতির এক নিজস্ব প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠতো। তিনি বিভিন্ন সময়ে শিল্পকলা একাডেমি এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে অধিষ্ঠিত ছিলেন এবং দেশের শিল্প ও সংস্কৃতির প্রসারে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তার নির্দেশনায় অসংখ্য টেলিভিশন অনুষ্ঠান ও নাটক নির্মিত হয়েছে যা দর্শকের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে। তিনি ২০০৪ সালে শিল্পকলায় তার অসামান্য অবদানের জন্য দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত হন।

তার মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সংস্কৃতিমন্ত্রী সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে। তারা মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বলেছেন যে, তার সৃজনশীল কর্ম এবং শিল্পকলার প্রতি তার নিবেদন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সর্বদা অনুপ্রাণিত করবে। তার মতো একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী শিল্পীর চলে যাওয়া দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি তার কর্মের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতিতে অমর হয়ে থাকবেন।

এছাড়াও

ক্যাডেট কলেজে ভর্তি ২০২৭: স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের বিস্তারিত রূপরেখা

ক্যাডেট কলেজে ভর্তি ২০২৭: স্বপ্নের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশের বিস্তারিত রূপরেখা

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ক্যাডেট কলেজগুলো বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে আসছে। সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, মানসম্মত শিক্ষা এবং …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *