সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটা, গুগল এবং অ্যামাজনের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর ডিজিটাল সেবা কর (Digital Services Tax – DST) আরোপকারী দেশগুলোর পণ্যে শতভাগ শুল্ক আরোপের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তার এই আকস্মিক ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে নতুন করে বাণিজ্য উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যদি কোনো দেশ মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর ডিজিটাল সেবা কর আরোপ করে, তাহলে ওই দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সব পণ্যের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে। তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেছেন যে, ইউরোপের অনেক দেশ মার্কিন কোম্পানিগুলোর ওপর ডিজিটাল সেবা কর আরোপের বিষয়ে আলোচনা করছে এবং এর মধ্যে কয়েকটি দেশ খুব শিগগির এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে। ট্রাম্পের মতে, এই শুল্ক বিদ্যমান বা ভবিষ্যতে হতে যাওয়া যেকোনো বাণিজ্যচুক্তির চেয়ে প্রাধান্য পাবে, যা তার বাণিজ্য নীতির কঠোরতা পুনর্ব্যক্ত করে।
ডিজিটাল সেবা কর মূলত এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো দেশের বাজারে ব্যবসা করে বৃহৎ বহুজাতিক প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর অর্জিত আয়ের ওপর কর ধার্য করা হয়। এই করের মূল লক্ষ্য থাকে মেটা, গুগল, অ্যামাজনের মতো বিশ্বের বৃহত্তম প্রযুক্তি সংস্থাগুলো, যারা প্রায়শই বিভিন্ন দেশে তাদের বিশাল আয়কে করের আওতার বাইরে রাখতে সক্ষম হয়। বিশ্বজুড়ে এক ডজনেরও বেশি দেশ ইতোমধ্যে এই ধরনের কর কার্যকর করেছে বা তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে, যা ডিজিটাল অর্থনীতির দ্রুত প্রসারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে রাজস্ব আদায়ের একটি নতুন উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও ট্রাম্প তার পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি, তবে তিনি ‘বেশ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের’ কথা বলেছেন। ফলে ডিজিটাল সেবা কর চালুর বিষয়ে এগিয়ে থাকা ফ্রান্স, ইতালি, যুক্তরাজ্য বা স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশগুলো তার ঘোষিত শুল্কের মুখে পড়তে পারে। এর আগে কানাডাও ডিজিটাল সেবা কর চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল। সে সময় ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, এই কর কার্যকর হলে কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া হবে। পরে তীব্র চাপের মুখে কানাডা সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে, যা ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য কৌশলের একটি উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে ট্রাম্পের এই নতুন শুল্ক আরোপের হুমকি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে আইনি মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নির্দিষ্ট দেশগুলোর বিরুদ্ধে শতভাগ শুল্ক আরোপের জন্য তার আইনি ক্ষমতা এখনো স্পষ্ট নয়। অতীতে, যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বৈশ্বিক পাল্টা শুল্ক পরিকল্পনা বাতিল করে রায় দিয়েছিল। আদালত তখন বলেছিল যে, ‘ইন্টারন্যাশনাল ইমার্জেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট’ প্রশাসনকে এ ধরনের বিস্তৃত ও দেশভিত্তিক শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না।
পরবর্তীতে ট্রাম্প ১৯৭৪ সালের ‘ট্রেড অ্যাক্ট’–এর ১২২ ধারার আওতায় নতুন করে ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক আরোপের একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছিলেন। কিন্তু ওই আইনের আওতায় আরোপিত শুল্ক কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া সর্বোচ্চ ১৫০ দিন পর্যন্ত কার্যকর রাখা যায়। সে কারণে, ডিজিটাল সেবা কর আরোপকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ট্রাম্পের নতুন হুমকি বাস্তবায়নে গুরুতর আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বাণিজ্য ও আইন বিশেষজ্ঞরা। এই পদক্ষেপের ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে