মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো যেন এক ‘পুরোনো ভূত’-এর মতো ফিরে ফিরে আসছে। বারবার উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও অভিবাসন প্রক্রিয়া ঘিরে অনিয়ম, উচ্চ অভিবাসন ব্যয় এবং সিন্ডিকেটের একচেটিয়া প্রভাবের অভিযোগ এখনও বিদ্যমান। অভিবাসী কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়া একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হলেও, এই বাজারকে ঘিরে অস্বচ্ছতা ও শোষণ বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না, যা কর্মীদের স্বপ্ন ও দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করছে।
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী সেখানে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। তবে, এই সুযোগকে কাজে লাগানোর পথে বরাবরই কিছু অসাধু চক্র বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) এবং বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চালু হলেও, প্রতিবারই উচ্চ অভিবাসন ব্যয় এবং নির্দিষ্ট কিছু এজেন্সির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে। এই ‘সিন্ডিকেট’ ব্যবস্থা কর্মীদের ওপর ঋণের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে এবং তাদের ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
সর্বশেষ কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চুক্তি সত্ত্বেও, কর্মীদের মালয়েশিয়া যেতে কয়েক লাখ টাকা খরচ করতে হচ্ছে, যা সরকারি নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি। এই অতিরিক্ত অর্থের বেশিরভাগই চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগী এবং কথিত সিন্ডিকেটের পকেটে। এর ফলে, ঋণ করে বিদেশে যাওয়া কর্মীরা প্রায়শই সেখানে গিয়ে প্রত্যাশিত কাজ বা বেতন না পেয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। কেউ কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই দেশে ফিরতে বাধ্য হন, আবার কেউ কেউ অবৈধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করেন।
এই সমস্যার মূলে রয়েছে নিয়োগ প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার। মালয়েশিয়া সরকার এবং বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন খুবই দুর্বল। অভিযোগ রয়েছে যে, উভয় দেশের কিছু প্রভাবশালী মহল এই সিন্ডিকেটকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন করে, যার ফলে তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই চক্রগুলো কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে এবং তাদের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করে।
এছাড়াও, কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব একটি বড় সমস্যা। কোন এজেন্সি কত কর্মী পাঠাচ্ছে, তাদের খরচ কত হচ্ছে, এবং কর্মীরা সেখানে গিয়ে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন – এসব তথ্য সঠিকভাবে যাচাই ও প্রকাশ করা হয় না। ফলে, প্রতারিত কর্মীদের অভিযোগ জানানোর বা প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সুনাম ক্ষুণ্ণ করছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে সিন্ডিকেটমুক্ত করে কর্মীদের জন্য একটি নিরাপদ ও ন্যায্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে উভয় সরকারের পক্ষ থেকে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে অভিবাসন ব্যয় কমানো, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় শতভাগ স্বচ্ছতা আনা, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা, এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির একটি কার্যকর প্রক্রিয়া চালু করা। একই সাথে, কর্মীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে অবহিত করাও অত্যন্ত জরুরি। এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা গেলে কেবল মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারই নয়, বাংলাদেশের সামগ্রিক বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতের চিত্রও ইতিবাচকভাবে বদলে যাবে এবং হাজার হাজার অভিবাসী কর্মীর মুখে হাসি ফুটবে।
পরিশেষে বলা যায়, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে যে ‘পুরোনো ভূত’ এখনও জেঁকে বসে আছে, তা দূর করতে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ। কর্মীদের ঘামের টাকায় গড়ে ওঠা এই বাজারকে লোভী চক্রের হাত থেকে রক্ষা করা না গেলে, দেশের অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য এবং কর্মীদের দুর্ভোগের অবসান হবে না।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে