বাংলাদেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের মানবসম্পদ উন্নয়নে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির জন্য অত্যাবশ্যকীয় এই খাতে জাইকার সহযোগিতা বাংলাদেশকে একটি স্মার্ট ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডিজিটাল বাংলাদেশের সফল পথচলার পর সরকার এখন ২০৪১ সালের মধ্যে একটি স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এই মহাপরিকল্পনার মূল স্তম্ভগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ ও এর সঠিক প্রয়োগ। এআই প্রযুক্তির প্রসার কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি, শিল্প এবং জনসেবাসহ বিভিন্ন খাতে উদ্ভাবনী সমাধান এনে দিতে পারে। তবে, এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি। জাইকা ঠিক এই জায়গাতেই বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে, এআই সংশ্লিষ্ট মেধা বিকাশে বিভিন্ন ধরনের কারিগরি ও প্রশিক্ষণমূলক সহায়তা প্রদান করে।
জাইকার এই সহযোগিতা মূলত দুটি প্রধান ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। প্রথমত, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে এআই সংক্রান্ত গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার সুযোগ পাচ্ছেন। উন্নত ল্যাব স্থাপন, আধুনিক কারিকুলাম প্রণয়ন এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ প্রদানের মতো উদ্যোগগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। দ্বিতীয়ত, পেশাদারদের জন্য দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি চালু করা। এটি শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী এআই প্রকৌশলী, ডেটা বিজ্ঞানী এবং মেশিন লার্নিং বিশেষজ্ঞদের মতো দক্ষ জনবল তৈরি করতে সাহায্য করবে। এর ফলে, স্থানীয় শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনে আরও সক্ষম হয়ে উঠবে।
বাংলাদেশের জন্য এআই মেধা বিকাশ একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। এ খাতে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব, উন্নত গবেষণা অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং প্রয়োজনীয় ডেটা ইকোসিস্টেমের অনুপস্থিতি অন্যতম প্রধান বাধা। জাইকার সহযোগিতা এই বাধাগুলো অতিক্রম করতে একটি শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। তারা শুধুমাত্র আর্থিক সহায়তা নয়, বরং জাপানের দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অবদান রাখছে। এই জ্ঞান বিনিময় কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষকরা জাপানের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশিক্ষণের সুযোগ পাচ্ছেন, যা তাদের দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাইকার এই ধরনের উদ্যোগ বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতেও সহায়ক হবে। যখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে আস্থা রাখে, তখন অন্যান্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানও এখানে বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করবে।
সরকারও এআই প্রযুক্তির বিকাশে বদ্ধপরিকর। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এআই কৌশলপত্র প্রণয়ন, এআই ল্যাব স্থাপন এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে সমর্থন করার মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। জাইকার সহযোগিতা সরকারের এই প্রচেষ্টাকে আরও বেগবান করছে। এটি নিশ্চিত করবে যে বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত এবং বিশ্ব অর্থনীতির মূল ধারায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম।
ভবিষ্যতে, জাইকা এবং বাংলাদেশের মধ্যে এআই খাতে সহযোগিতা আরও গভীর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত করে তুলবে এবং তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে শাণিত করবে, যা ultimately একটি সমৃদ্ধ ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে