দীর্ঘদিনের সংঘাতময় ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসন এবং নিরীহ ফিলিস্তিনিদের হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই নিন্দা জ্ঞাপন করেছে, যেখানে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ করে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই বিবৃতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরে, যা ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সবসময় সমর্থন জানিয়ে এসেছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর নির্বিচার হামলা, বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে অসংখ্য নারী, শিশু এবং বৃদ্ধসহ নিরপরাধ মানুষের জীবনহানি ঘটছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ সরকার এই ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক বিপর্যয়ের তীব্র নিন্দা জানিয়ে আক্রান্তদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছে। একইসাথে, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশের দৃঢ় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে, যার রাজধানী হবে পূর্ব জেরুজালেম।
বাংলাদেশের এই নিন্দা এমন এক সময়ে এলো যখন গাজা উপত্যকা এবং পশ্চিম তীরে মানবিক পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। ইসরায়েলি অবরোধের কারণে খাদ্য, পানি, বিদ্যুৎ ও চিকিৎসা সামগ্রীর তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা লাখ লাখ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশও আন্তর্জাতিক ফোরামে ফিলিস্তিনি জনগণের অধিকার আদায়ের পক্ষে জোরদার ভূমিকা পালনের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।
ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ ফিলিস্তিন সমস্যার একটি ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী সমাধানের পক্ষে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই ফিলিস্তিনি মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে আসছে এবং ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। এই অবস্থান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর নীতিকে প্রতিফলিত করে। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বেও এই পররাষ্ট্রনীতি অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে একটি টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিক প্রস্তাবনা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলতে হবে। ইসরায়েলকে অবশ্যই দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড থেকে সরে আসতে হবে এবং ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সম্মান জানাতে হবে। বাংলাদেশ মনে করে, দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ, যা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে ফিলিস্তিন ইস্যুতে বিভিন্ন সময়ে ভোটাভুটি এবং আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবসময় ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের আহ্বান হলো, তারা যেন ইসরায়েলের উপর চাপ সৃষ্টি করে অবিলম্বে সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করে এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ সুগম করে। পাশাপাশি, যুদ্ধাপরাধের জন্য দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার দাবিও জানিয়েছে বাংলাদেশ। এই সংঘাতের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বরং বিশ্বজুড়েই শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে বলে মন্তব্য করা হয়েছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে