বাংলাদেশে বর্তমানে ডায়াবেটিস আক্রান্তের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, আর এই পরিস্থিতির সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ফ্যাটি লিভার বা যকৃতে চর্বি জমার সমস্যা। চিকিৎসাবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে ‘মেটাবলিক ডিসফাংশন অ্যাসোসিয়েটেড স্টিয়াটোটিক লিভার ডিজিজ’ বা এমএএসএলডি (MASLD) হিসেবে অভিহিত করা হয়। যদিও সাধারণ মানুষের কাছে ডায়াবেটিস ও ফ্যাটি লিভারকে ভিন্ন দুটি রোগ মনে হতে পারে, কিন্তু চিকিৎসকরা বলছেন, উভয়ের মূল উৎস একই বিপাকীয় জটিলতা—যাকে বলা হয় ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’। যখন আমাদের শরীর ইনসুলিনকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়, তখন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং একই সাথে যকৃতে চর্বি জমতে শুরু করে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ডায়াবেটিস রোগীর ক্ষেত্রেই ফ্যাটি লিভারের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।
ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে ভয়ের কারণ হলো এর নীরব প্রকৃতি। প্রাথমিক অবস্থায় এই রোগটি সাধারণত কোনো স্পষ্ট উপসর্গ প্রকাশ করে না। অনেক ক্ষেত্রে রোগী কেবল সামান্য ক্লান্তি বা পেটের ডান দিকে অস্বস্তি অনুভব করতে পারেন, যা অধিকাংশ মানুষই অবহেলা করেন। অথচ ভেতরে ভেতরে লিভারে প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন বাড়তে থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এবং এমনকি লিভার ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী পরিস্থিতির দিকে ধাবিত করতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে এমএএসএলডি থাকলে হৃদ্রোগ, স্ট্রোক এবং কিডনি জটিলতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম জানান, ডায়াবেটিস রোগীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার অংশ হিসেবে বছরে অন্তত একবার লিভার পরীক্ষা করা অপরিহার্য। আলট্রাসনোগ্রাফি এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে (যেমন এএলটি বা এএসটি) সহজেই ফ্যাটি লিভার শনাক্ত করা সম্ভব। এই রোগ থেকে উত্তরণের প্রধান চাবিকাঠি হলো জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন। ওজন ৫ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলেই ডায়াবেটিস এবং ফ্যাটি লিভার—উভয়ই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সুস্থ জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাদ্যতালিকা থেকে অতিরিক্ত মিষ্টি ও ভাজাপোড়া খাবার বাদ দিয়ে প্রচুর পরিমাণে সবুজ শাকসবজি ও পুষ্টিকর ফলমূল যুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখে। চিকিৎসকদের মতে, সঠিক সচেতনতা এবং স্বাস্থ্যসম্মত জীবনধারা অনুসরণ করলে এই নীরব ঘাতক থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব। তবে যেকোনো জটিলতা দেখা দিলে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে