ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সম্প্রতি আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ সেমিনারে দেশের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে গভীর আলোচনা হয়েছে। ‘স্টেট অব সোশ্যাল সায়েন্স রিসার্চ ইন বাংলাদেশ: পাস্ট হিস্টোরিজ, কনটেম্পোরারি ট্রেন্ডস অ্যান্ড ফিউচার ডিরেকশনস’ শীর্ষক এই সেমিনারে বক্তারা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার থিয়েটার ভবনের উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা বর্তমান প্রেক্ষাপটে গবেষণার মানোন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সংযুক্তি এবং নীতিগত প্রয়োগের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তনশীল এক বাস্তবতার মুখোমুখি। প্রযুক্তিগত বিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিগ ডেটার ক্রমবর্ধমান প্রভাব, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক সংকট, দ্রুত নগরায়ণ এবং সমাজের অভ্যন্তরীণ রূপান্তর—এই সবকিছুই নতুন নতুন সামাজিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কীভাবে প্রাসঙ্গিক থাকবে এবং সমাজের প্রকৃত চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে, তা নিয়ে সেমিনারে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা উল্লেখ করেন, প্রচলিত গবেষণা পদ্ধতি ও চিন্তাভাবনা দিয়ে এই জটিল সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব নয়, বরং প্রয়োজন একটি যুগোপযোগী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক গবেষণা কাঠামো, যা পরিবর্তিত সামাজিক গতিশীলতা সঠিকভাবে অনুধাবন ও বিশ্লেষণ করতে পারবে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মো. শামছুল আলম। তিনি তাঁর বক্তব্যে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় এআই এবং নতুন প্রযুক্তির প্রভাবকে একটি বড় বাস্তবতা হিসেবে উল্লেখ করেন। অধ্যাপক আলম বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুললেও এর সঙ্গে মৌলিকত্ব ও গবেষণা নৈতিকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোও সামনে চলে এসেছে। তিনি গত এক যুগে সমাজ ও রাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া ব্যাপক পরিবর্তন, বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের মানসিকতা এবং সামাজিক রূপান্তরের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আরও গভীর গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের মধ্যে সমন্বিত গবেষণার মাধ্যমে সামাজিক বিজ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম তাঁর বক্তব্যে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার নতুন দিগন্তগুলো চিহ্নিত করেন। তিনি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন, ডিজিটাল অর্থনীতি, গিগ ইকোনমি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং বার্ধক্যের মতো বিষয়গুলোকে ভবিষ্যতের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে তুলে ধরেন। তবে তিনি আন্তবিষয়ক গবেষণা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা অবকাঠামো, তথ্যপ্রাপ্তি এবং গবেষণার ফল নীতিনির্ধারণে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বড় ধরনের সীমাবদ্ধতাগুলোও তুলে ধরেন, যা গবেষণার কার্যকর প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান। তাঁর বক্তব্যে অধ্যাপক রহমান সেমিনারের মূল উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, এই আয়োজনের লক্ষ্য কেবল গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন নয়, বরং বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভিত্তি, ঐতিহাসিক ধারা এবং বর্তমান পদ্ধতিগত কাঠামোকে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা। অধ্যাপক রহমান বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাকে আরও আত্মপ্রতিফলনশীল, জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে সুদৃঢ় এবং সমাজ-রূপান্তরকারী ধারায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের গবেষণা বৈশ্বিক জ্ঞানচর্চায় একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. কাজী মারুফুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক নিলয় রঞ্জন বিশ্বাস, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. তারিকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর এম আসলাম আলম। তাঁদের বক্তব্যেও আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গবেষণার পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। সেমিনারের শেষ পর্বে শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি প্রাণবন্ত প্রশ্নোত্তর ও মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার সীমাবদ্ধতা, সম্ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে খোলামেলা মতবিনিময় করা হয়। এই সেমিনার বাংলাদেশের সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণাকে নতুন পথে চালিত করতে এবং সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে একটি দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে