সাড়ে তিন বছর আগের ভয়াবহ অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ আয়ভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী, দেশটি নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ‘উচ্চ মধ্যম আয়ের’ দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। ২০২২ সালে সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো শ্রীলঙ্কার এই ঘুরে দাঁড়ানোর ঘটনাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের এক অনন্য গল্প’ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, যা এই সাফল্যের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্প খাতের চাকা সচল হওয়া, পর্যটন শিল্পের পুনরুজ্জীবন এবং আর্থিক সেবা খাতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক ভিতকে পুনরায় মজবুত করেছে। ২০১৯ সালের ইস্টার সানডে হামলা, করোনা মহামারির প্রভাব এবং পরবর্তীতে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যের সংকটে দেশটির অর্থনীতি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ মন্দার কবলে পড়েছিল। সেই বিপর্যয়কর অবস্থা থেকে উত্তরণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সহায়তায় গৃহীত কঠোর রাজস্ব সংস্কার, মুদ্রানীতির আধুনিকায়ন এবং বৈদেশিক ঋণ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
বিশ্বব্যাংক তাদের শ্রেণিবিন্যাসে দেশগুলোকে মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) ভিত্তিতে চারটি ভাগে ভাগ করে থাকে। শ্রীলঙ্কার এই নতুন মর্যাদা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত উন্নয়ন নয়, বরং এটি দেশটির অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতার একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। পর্যটন খাত থেকে আয় বৃদ্ধি, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিস্থিতির উন্নতির ফলে টানা দুই বছরের অর্থনৈতিক সংকোচনের পর দেশটি পুনরায় প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরেছে।
এই নতুন শ্রেণিবিভাগ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী মানদণ্ড হিসেবে কার্যকর থাকবে। ২১৮টি দেশের তালিকায় শ্রীলঙ্কার এই অবস্থান পরিবর্তন দেশটির বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারেও সহায়ক হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অর্জনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এখন দ্বীপরাষ্ট্রটির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সামগ্রিকভাবে, শ্রীলঙ্কার এই উত্তরণ যুদ্ধবিধ্বস্ত বা অর্থনৈতিকভাবে ধসে পড়া দেশগুলোর জন্য একটি অনুপ্রেরণামূলক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে