চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) বা অর্থনৈতিক করিডোরে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দীর্ঘ সময় ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। বিশেষ করে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে চীনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও চীনের মতো দুটি বৃহৎ শক্তির মাঝে এক কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। এই করিডোরে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বন্দর সুবিধা এবং জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকলেও, এর বিপরীতে কিছু জটিল চ্যালেঞ্জও রয়েছে যা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
প্রথমত, ঋণ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে বিআরআই প্রকল্পের মাধ্যমে নেওয়া ঋণের বোঝা যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে, তা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা যাচাই করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। চীন সাধারণত তাদের নিজস্ব ঠিকাদার এবং শ্রমিকদের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, যা স্থানীয় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করতে পারে। এছাড়া, পরিবেশগত প্রভাব এবং প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ। বাংলাদেশ তার দীর্ঘদিনের কৌশলগত অংশীদার ভারতের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চীনের অর্থনৈতিক সুবিধা গ্রহণ করতে চায়। তবে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক করিডোরে অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা নয়াদিল্লির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তার নিয়ে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ রয়েছে। ফলে, বাংলাদেশ যখন চীনের কোনো বড় প্রকল্প গ্রহণ করে, তখন তা আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখার পরীক্ষা হয়ে দাঁড়ায়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বর্তমানে এই ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা। বড় বড় প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার আগে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রকল্পের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা জরুরি। বিআরআই-এর আওতায় যেসব প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলোর উপযোগিতা ও অর্থনৈতিক রিটার্ন (ROI) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন। অনেক সময় রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া প্রকল্পগুলো দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়ায়, যা বর্তমান সরকার পরিবর্তনের পর নতুন করে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পরিশেষে, চীনের সাথে অর্থনৈতিক করিডোর কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হলো চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে দেশের সার্বভৌমত ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা অক্ষুণ্ণ থাকে। একই সাথে, পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের মাধ্যমেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে