মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক বৈধতা বহাল রেখে একটি যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেছে। এই রায়টি ১৪তম সংশোধনীর অধীনে দেশের নাগরিকত্ব নীতির দীর্ঘস্থায়ী অবস্থানকে নিশ্চিত করেছে, যা সম্ভাব্য একটি সাংবিধানিক সংকট থেকে দেশকে রক্ষা করেছে। যদিও সিদ্ধান্তটি শেষ পর্যন্ত বহাল রয়েছে, তবে আদালতের ভেতরের তীব্র বিভাজন এবং ভিন্নমত এটিকে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ধারণাটি মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী, বিশেষত এর ‘সিটিজেনশিপ ক্লজ’ দ্বারা সুরক্ষিত। ১৮৬৮ সালে গৃহযুদ্ধের পর এটি গৃহীত হয়েছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত দাসদের এবং তাদের উত্তরসূরিদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা। এই ধারাটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী বা স্বাভাবিকীকরণপ্রাপ্ত এবং এর এখতিয়ারের অধীন সকল ব্যক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং তারা যে রাজ্যে বসবাস করে সে রাজ্যেরও নাগরিক।” এটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মার্কিন অভিবাসন ব্যবস্থার একটি মৌলিক ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বিশেষ করে অভিবাসন-বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষ থেকে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের এই নীতিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। তাদের প্রধান যুক্তি ছিল, তথাকথিত ‘বার্থ ট্যুরিজম’ বা ‘জন্ম পর্যটন’ এর মাধ্যমে অ-নাগরিকরা শুধুমাত্র তাদের সন্তানদের মার্কিন নাগরিকত্ব প্রদানের উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। সমালোচকরা দাবি করেন যে, এই নীতি দেশের সীমান্ত সুরক্ষাকে দুর্বল করে এবং অবৈধ অভিবাসনকে উৎসাহিত করে। রক্ষণশীল মহল থেকে এই সাংবিধানিক ব্যাখ্যার পরিবর্তনের জন্য আহ্বান জানানো হচ্ছিল, যা দেশের অভিবাসন নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারত।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় এমন এক সময়ে এসেছে যখন আদালত নিজেই গভীর আদর্শিক বিভাজনে ভুগছে। একটি সূত্রের মতে, এই সিদ্ধান্তটি মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে একটি “সাংবিধানিক বিপর্যয়” থেকে রক্ষা পেয়েছে। এর অর্থ হলো, যদি একজন বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করতেন, তাহলে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুদূরপ্রসারী সাংবিধানিক ভিত্তি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারত। সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা ১৪তম সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য এবং এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে অক্ষুণ্ণ রাখার পক্ষে রায় দেন, যা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের বর্তমান ব্যাখ্যাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে।
আদালতের অভ্যন্তরে এই বিতর্কের তীব্রতা বিচারপতিদের ভিন্নমতে স্পষ্ট হয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, বিচারপতি কেতানজি ব্রাউন জ্যাকসন বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাসের ভিন্নমতের তীব্র সমালোচনা করেছেন। বিচারপতি থমাস তার ভিন্নমতে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ঐতিহ্যবাহী ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন এবং এর একটি সংকীর্ণতর ব্যাখ্যা প্রস্তাব করেছিলেন, যা কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য নাগরিকত্বের অধিকার সীমিত করতে পারত। বিচারপতি জ্যাকসন তার প্রতিক্রিয়ায় সাংবিধানিক অধিকারের সুরক্ষা এবং ১৪তম সংশোধনীর মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি আদালতের অঙ্গীকারের ওপর জোর দেন, যা দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জন্য অপরিহার্য।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সাংবিধানিক ভিত্তি নিশ্চিত করলেও, এটি ‘জন্ম পর্যটন’ নিয়ে উদ্বেগ পুরোপুরি দূর করেনি। রায়ের পর মার্কিন বিচার বিভাগ (DOJ) ঘোষণা করেছে যে তারা ‘জন্ম পর্যটন’ স্কিমগুলো তদন্ত করবে। এর অর্থ হলো, সরকার এখন বিদ্যমান আইন প্রয়োগের দিকে মনোনিবেশ করবে যাতে অ-নাগরিকরা অবৈধভাবে বা প্রতারণামূলক উপায়ে মার্কিন নাগরিকত্ব সুবিধা না নিতে পারে। এটি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ না করে, বরং এর অপব্যবহার রোধের একটি প্রচেষ্টা।
সামগ্রিকভাবে, এই রায় মার্কিন অভিবাসন বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি দেশের নাগরিকত্ব নীতির মৌলিক স্তম্ভকে রক্ষা করেছে, তবে অভিবাসন নীতি এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক অব্যাহত থাকবে। জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আইনি বা রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তবে সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রায় এর সাংবিধানিক অবস্থানকে আপাতত সুদৃঢ় করেছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে