চট্টগ্রামের সদরঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীতে নোঙর করা একটি মাছ ধরার নৌযানে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ছয়জন নাবিক গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন। মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে এফভি দেশ নামক নৌযানটির ইঞ্জিন কক্ষ থেকে আকস্মিক বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এই ঘটনায় তিনজনের শরীরের শতভাগ পুড়ে গেছে এবং তাদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। বাকি তিনজন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সদরঘাট নৌ থানা সূত্রে জানা গেছে, এফভি দেশ নামের ফিশিং ভেসেলটি সোমবার দুপুর ২টার দিকে কর্ণফুলী নদীর সদরঘাটের সাম্পানঘাট এলাকার একটি মুরিং বয়ায় নোঙর করেছিল। নৌযানটি গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। মঙ্গলবার দুপুরে হঠাৎ করেই ইঞ্জিন কক্ষ থেকে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে নৌযানে উপস্থিত নাবিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ছিল যে, ইঞ্জিন কক্ষের আশপাশের অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
দগ্ধ ছয় নাবিকের মধ্যে প্রকৌশলী আশিকুজ্জামান তামিম (২২), নাবিক মো. রুবেল (৩২) এবং শাহ আলম (৪০) সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সহকারী রেজিস্ট্রার লিটন কুমার পালিত জানিয়েছেন, এই তিনজনের শরীরের শতভাগ পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি শ্বাসনালিও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা তাদের জীবনকে চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে। তাদের জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে। শতভাগ দগ্ধ রোগীর ক্ষেত্রে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি নিবিড় পরিচর্যা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন হয়।
অপর তিন দগ্ধ নাবিক হলেন নিজাম উদ্দিন (৩৭), মো. রাসেল (৩৫) ও ছিদ্দিক আহমেদ (৫০)। তাদের শরীরের ২ থেকে ৫ শতাংশ পুড়েছে এবং তারা বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন। তাদের অবস্থা গুরুতর না হলেও, পোড়া ক্ষতের সংক্রমণ প্রতিরোধে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দা এবং অন্যান্য নৌযানের কর্মীরা ছুটে এসে উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেন। পরে ফায়ার সার্ভিস এবং নৌ পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দগ্ধদের হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে।
এই ঘটনায় নৌযানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ইঞ্জিন রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণত মাছ ধরার নৌযানগুলোতে নিয়মিত ইঞ্জিন পরীক্ষা এবং রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। প্রাথমিক তদন্তে ইঞ্জিন কক্ষে গ্যাস জমে অথবা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিস্ফোরণ হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নৌ পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একটি বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে। তারা নৌযানটির মালিকানা, ফিটনেস সনদ এবং সর্বশেষ রক্ষণাবেক্ষণের তথ্য যাচাই করছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়শই অসতর্কতা বা নিরাপত্তা প্রোটোকল না মানার কারণে ঘটে থাকে, যা সমুদ্রগামী নাবিকদের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলে।
কর্ণফুলী নদী চট্টগ্রামের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত ছোট-বড় নৌযান এই নদীতে চলাচল করে। তাই নদীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নৌযানগুলোর যথাযথ মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুর্ঘটনার ফলে নৌযান শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং নাবিকদের জীবন সুরক্ষিত থাকে। দগ্ধ নাবিকদের দ্রুত আরোগ্য কামনা এবং তাদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে