ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যায় বহু প্রতীক্ষিত রামমন্দিরের দানসামগ্রী ও নির্মাণ তহবিলের অর্থ আত্মসাৎ ঘিরে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল আকার ধারণ করছে। এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অযোধ্যা বার অ্যাসোসিয়েশন এক কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেখানে অভিযুক্তদের পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে লড়বেন না বলে ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই নির্দেশ অমান্য করে কোনো আইনজীবী যদি অভিযুক্তদের হয়ে সওয়াল করেন, তবে তাঁকে পাঁচ লাখ রুপি জরিমানা দিতে হবে।
সোমবার এক জরুরি বৈঠকে অযোধ্যা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যরা এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে, মন্দিরের যে তিন পদাধিকারীর বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের তিন দিনের মধ্যে অযোধ্যা ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই তিন ব্যক্তি হলেন ‘শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থ ক্ষেত্রে ট্রাস্ট’–এর সাধারণ সম্পাদক চম্পত রাই এবং সদস্য অনিল মিশ্র ও গোপাল রাও। বার অ্যাসোসিয়েশনের বক্তব্য, এই তিন ট্রাস্টি অযোধ্যার সুনাম ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন এবং তাঁরা শহর ত্যাগ না করলে শহর অবরুদ্ধ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। সংগঠনটি অবিলম্বে এই তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার জন্য আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে এবং তদন্তের ভার কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিবিআই)-এর হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে।
অভিযোগের তদন্ত শুরু হওয়ার পর থেকেই চম্পত রাই, অনিল মিশ্র এবং গোপাল রাও পদত্যাগ করেছেন। যদিও প্রথম দিকে তাঁরা চুরির অভিযোগকে আমলে নেননি। এই তিনজনই বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং মন্দির নির্মাণ তদারকি থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজকর্মের সঙ্গে শুরু থেকেই যুক্ত ছিলেন। চম্পত ও অনিল উত্তর প্রদেশের বাসিন্দা হলেও গোপাল রাও আদতে কর্নাটকের বাসিন্দা।
রাজ্য সরকার এই অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে একটি বিশেষ দল গঠন করার পর এ পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আদালত তাঁদের দুই সপ্তাহ কারা হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে চম্পত রাইয়ের গাড়িচালক রামশঙ্কর যাদব ওরফে টিন্নু এবং অনিল মিশ্রর আত্মীয় অনুকল্প মিশ্র ও লবকুশ মিশ্র রয়েছেন। ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তারকৃতদের বাড়ি থেকে ৮০ লাখ রুপি উদ্ধার করা হয়েছে। তবে মোট আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ কত, তা এখনো সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। রাজনৈতিক মহলের অভিযোগ, এই লুটের পরিমাণ কয়েকশ কোটি রুপি হতে পারে। তদন্তকারী দল এখন আত্মসাৎকৃত অর্থ কোথায় খাটানো হয়েছে, তার খোঁজ করছে।
লুটের মধ্যে দানবাক্সে ফেলা সোনা-রুপার গয়নাও রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মহারাষ্ট্রের উদ্ধব গোষ্ঠী শিবসেনার নেতা ও রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় রাউত অভিযোগ করেছেন যে, মন্দির নির্মাণে উদ্ধব ঠাকরে ১ কোটি রুপি ও চার কেজি রুপার ইট দান করেছিলেন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ এখনো তার রসিদ দেয়নি। এছাড়াও, রামমন্দিরের দানের ৩৫০০ কোটি রুপির কোনো হিসাব নেই এবং নিরীক্ষায় আত্মসাতের বিষয়টি উঠে এসেছে।
এই কেলেঙ্কারি ঘিরে রাজনৈতিক মহলেও তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কংগ্রেস নেতারা দাবি করেছেন যে, রামমন্দিরের অর্থ আত্মসাতের দায় যোগী-মোদি সরকার একে অপরের ওপর চাপাতে চাইছে। দানসামগ্রী লুটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে অযোধ্যা অভিযানের শুরুতেই উত্তর প্রদেশের কংগ্রেস নেতাদের আটক করা হয়েছে। সোমবার গভীর রাতে ও মঙ্গলবার সকালে কংগ্রেস প্রতিনিধিদলের নেতাদের আটক করা হয়, যখন তাঁরা রামমন্দির যাওয়ার কর্মসূচি নিয়েছিলেন। উত্তর প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অজয় রাইকে মন্দির চত্বর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে ‘গৃহবন্দি’ করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, চুরি নিয়ে বিজেপি এতটাই ভীত যে বিরোধীদের মন্দিরেও যেতে দিচ্ছে না। রায়বেরিলির কংগ্রেসদলীয় সংসদ সদস্য কিশোরীলাল শর্মা এবং বরাবাঁকির সংসদ সদস্য তনুজ পুনিয়াসহ আরও অনেক নেতাকে আটক বা গৃহবন্দি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সরকারি উদ্যোগেই এই ট্রাস্ট ও মন্দির নির্মাণ কমিটি গঠিত হয়েছিল। ট্রাস্টের ১৫ সদস্যের মধ্যে ১২ জনই কেন্দ্রীয় সরকার মনোনীত। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রিন্সিপ্যাল সেক্রেটারি নৃপেন্দ্র মিশ্র ছিলেন মন্দির নির্মাণ কমিটির প্রধান। যদিও এই গুরুতর অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো কোনো মন্তব্য করেননি, যা বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন তুলেছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে