যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল নীতির ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা দেশটির দীর্ঘদিনের ‘ব্যতিক্রমী মিত্র’ হিসেবে ইসরায়েলের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এবং তাদের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কঠোর প্রয়োগের ফলে ইসরায়েলকেও এখন অন্যান্য মিত্রদেশের মতোই বিবেচনা করা হতে পারে বলে পলিটিকো ও অ্যাক্সিওসের একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই পরিবর্তন শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।
পলিটিকোর প্রতিবেদন অনুসারে, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলকে আর তার ‘ব্যতিক্রমী মিত্র’ হিসেবে দেখছে না। এর অর্থ হলো, ‘সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র’ নীতি এখন ইসরায়েলের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্রের বরাতে পলিটিকো জানিয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের প্রতিও একই ধরনের কৌশলগত নীতি অনুসরণ করছে, যা তারা অন্যান্য মিত্রদেশের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে থাকে। একজন ইসরায়েলি রাজনৈতিক উপদেষ্টা এই ধারণাকে সমর্থন করে বলেছেন, ইসরায়েল ভেবেছিল তারা এই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতার বাইরে থাকবে, যা আসলে একটি ভুল ধারণা ছিল এবং দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই ছিল না।
ইসরায়েলের প্রতি নীতিগত এই পরিবর্তনের অন্যতম জোরালো সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি ইসরায়েলের নেতৃত্বের কঠোর সমালোচনা করে অস্বাভাবিক রকম খোলাখুলি মন্তব্য করেছেন। ভ্যান্স ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেন যে, যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের ‘একমাত্র শক্তিশালী মিত্র’। একই সঙ্গে তিনি ওয়াশিংটনের সমর্থনকে নিশ্চিত বা স্বতঃসিদ্ধ ধরে না নেওয়ার ব্যাপারে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন, যা ইসরায়েলের জন্য এক নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
দুই দেশের সরকারের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে বলে পলিটিকোর প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এই দাবির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে পলিটিকো উল্লেখ করেছে, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ২০২৫ সালে পাঁচবার ওয়াশিংটন সফর করলেও, ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত মাত্র একবার সফর করেছেন, যা ছিল গত ফেব্রুয়ারিতে। হোয়াইট হাউসে নেতানিয়াহুর আরেকটি সফরের সম্ভাবনা এখন পর্যন্ত বিবেচনায় নেই এবং দুদেশের সরকারের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে।
সম্পর্কের এই অবনতির পেছনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনও একটি বড় কারণ। অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২ জুন টেলিফোনে কথোপকথনের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেতানিয়াহুর কঠোর সমালোচনা করেন। ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্য নীতি নিয়ে নেতানিয়াহুর অবস্থান ও পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করে তাকে ‘পাগল’ বলেও উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেন যে, ওই আলাপচারিতায় তিনি নেতানিয়াহুকে ‘পুরোপুরি পাগল’ বলেছিলেন এবং ‘বিবি, সব ইহুদি তোমার ওপর বিরক্ত’ বলে সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকিও দিয়েছিলেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক বরাবরই অত্যন্ত দৃঢ় ছিল, বিশেষ করে ট্রাম্পের পূর্ববর্তী শাসনামলে ইসরায়েলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তর, গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি এবং আব্রাহাম চুক্তির মতো পদক্ষেপগুলো সেই ব্যতিক্রমী মিত্রতারই প্রমাণ। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান নীতির পরিবর্তন ইসরায়েলের জন্য একটি বড় ধাক্কা। যদি ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় ক্ষমতায় আসে এবং এই নীতি কার্যকর করে, তবে ইসরায়েলকে হয়তো আরও বেশি স্বাবলম্বী হতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত অবস্থান পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে। এর ফলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অন্যান্য মিত্রদের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কও প্রভাবিত হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো সতর্ক করে আরও বলেছে, ‘সবচেয়ে খারাপ সময় আসা এখনো বাকি।’ এই নীতিগত পরিবর্তন এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককে এক নতুন এবং অনিশ্চিত পথে ঠেলে দিচ্ছে, যার দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গভীর প্রভাব ফেলবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে