মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়: নির্বাচন পরবর্তী মেইল-ইন ব্যালট গণনার বৈধতা

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়: নির্বাচন পরবর্তী মেইল-ইন ব্যালট গণনার বৈধতা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে ঘোষণা করেছে যে, নির্বাচনের দিনের পর পৌঁছানো মেইল-ইন ব্যালটগুলো গণনা করা যাবে, যা দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই সিদ্ধান্ত বিশেষত সেই ১৮টি রাজ্যের জন্য স্বস্তি এনেছে যেখানে নির্বাচনের দিন বা তার আগে পোস্টমার্ক করা ব্যালট দেরিতে পৌঁছালেও তা গণনার নিয়ম রয়েছে। এই রায় একদিকে যেমন ভোটারদের ভোটাধিকার সুরক্ষাকে প্রাধান্য দিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে রিপাবলিকান পার্টির পক্ষ থেকে এর তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছে, যার মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘প্রতারণা’র অভিযোগ অন্যতম।

২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় কোভিড-১৯ মহামারীর কারণে মেইল-ইন ব্যালটের ব্যবহার অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির কারণে অনেক ভোটার সশরীরে ভোটকেন্দ্রে না গিয়ে ডাকযোগে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। এই প্রেক্ষাপটে, মেইল-ইন ব্যালটের বৈধতা এবং গণনা পদ্ধতি নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্ক সৃষ্টি হয়। রিপাবলিকান পার্টি, বিশেষ করে ডোনাল্ড ট্রাম্প, মেইল-ইন ব্যালটের মাধ্যমে ভোট কারচুপির ব্যাপক অভিযোগ তোলেন, যদিও এসব অভিযোগের সমর্থনে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ মেলেনি। তাদের মূল আপত্তি ছিল যে, নির্বাচনের দিনের পরে প্রাপ্ত ব্যালটগুলো সন্দেহজনক এবং এগুলো গণনার অনুমতি দেওয়া উচিত নয়।

সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তটি মূলত রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি (RNC) এবং অন্যান্য রিপাবলিকান সংগঠনের করা একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে, যেখানে তারা নির্বাচনের দিনের পর প্রাপ্ত হাজার হাজার মেইল-ইন ব্যালট বাতিল করার দাবি জানিয়েছিল। ‘ওয়াটসন বনাম আরএনসি’ (Watson v. RNC) নামক এই মামলায় সর্বোচ্চ আদালত নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তকে বহাল রাখে এবং রাজ্যগুলোর আইনকে সমর্থন করে। আদালত যুক্তি দেয় যে, যদি ব্যালটগুলি নির্বাচনের দিন বা তার আগে সঠিকভাবে পোস্টমার্ক করা হয়, তবে ডাক বিভাগের বিলম্বের কারণে ভোটারদের তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা ঠিক হবে না। এই রায়টি রাজ্যগুলির নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে তাদের নিজস্ব আইন প্রণয়নের অধিকারকেও স্বীকৃতি দিয়েছে।

এই রায়ের ফলে ১৮টি রাজ্যের নির্বাচনী কর্মকর্তারা আইনি জটিলতা থেকে মুক্তি পেয়েছেন এবং তারা দেরিতে পৌঁছানো বৈধ ব্যালটগুলো গণনা করতে পারবেন। এটি নিশ্চিত করবে যে, ডাক বিভাগের অব্যবস্থাপনা বা অপ্রত্যাশিত বিলম্বের কারণে কোনো নাগরিকের ভোট যেন বাতিল না হয়। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় প্রতিটি বৈধ ভোট গণনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এই রায় সেই নীতিকে আরও শক্তিশালী করেছে। এটি বিশেষত সেইসব ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যারা বিভিন্ন কারণে দ্রুত ব্যালট জমা দিতে পারেননি কিন্তু আইনসম্মতভাবে তাদের ভোট দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাৎক্ষণিকভাবে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি এটিকে ‘প্রতারণা’ (CHEATING!) বলে অভিহিত করে তার অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অভিযোগ করেন যে, এই ধরনের রায় নির্বাচনের স্বচ্ছতা নষ্ট করবে। রিপাবলিকান দল দীর্ঘদিন ধরে মেইল-ইন ব্যালট এবং বিশেষত দেরিতে পৌঁছানো ব্যালট গণনার বিরোধিতা করে আসছে, তাদের যুক্তি হলো এটি কারচুপির সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে, ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং ভোটাধিকার কর্মীরা এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন, তাদের মতে এটি ভোটারদের অধিকার রক্ষা করে এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে।

এই রায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় মেইল-ইন ব্যালটের ভূমিকা এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চলমান বিতর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যোগ করেছে। এটি একদিকে যেমন রাজ্যগুলির নির্বাচনী স্বায়ত্তশাসনকে সম্মান জানিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে ভোটারদের ভোটাধিকারের সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে, মেইল-ইন ব্যালট নিয়ে রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং আইনি লড়াই যে ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, এই রায়ের প্রতিক্রিয়াই তার ইঙ্গিত বহন করে।

এছাড়াও

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়: স্বাধীন সংস্থা প্রধানদের অপসারণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক বিতর্ক

মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের যুগান্তকারী রায়: স্বাধীন সংস্থা প্রধানদের অপসারণে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক বিতর্ক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি একটি যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেছে, যা দেশের শাসনব্যবস্থায় এক নতুন …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *