ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে একটি সুদূরপ্রসারী ২০ বছর মেয়াদি একাডেমিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত বার্ষিক সিনেট সভায় সিনেট চেয়ারম্যানের বক্তৃতায় উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এই মহাপরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরেন। এই পরিকল্পনাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে প্রণীত হয়েছে এবং এর লক্ষ্য ২০৪৬ সালের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করা।
উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম জানান, ‘ঢাকা ইউনিভার্সিটি একাডেমিক প্ল্যান (২০২৬-৪৬)’ শীর্ষক এই বিশালাকার প্রকল্পটি পাঁচ ধাপে বাস্তবায়িত হবে। এর মূল দর্শন হলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন ও নৈতিক নেতৃত্বের জন্য অনুপ্রেরণার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলা। এটি কেবল একটি সাধারণ নীতিপত্র নয়, বরং আগামী দুই দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক রূপান্তরের একটি কৌশলগত ভিত্তি।
পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট পাঁচটি ধাপ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ধাপ ‘ওনারশিপ ফেজ’ (২০২৬-২৮)-এ পরিকল্পনার প্রতি দায়বদ্ধতা ও সংশ্লিষ্ট সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। এরপর ‘একসিলারেশন ফেজ’ (২০২৮-৩৩)-এ কাঠামোগত ও কার্যক্রমভিত্তিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করার ওপর জোর দেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপ ‘ট্রান্সফরমেশন ফেজ’ (২০৩৩-৩৮)-এর লক্ষ্য হলো শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশাসনে দৃশ্যমান ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা। চতুর্থ ধাপ ‘রেনেসাঁ ফেজ’ (২০৩৮-৪৩)-এ জ্ঞান, মূল্যবোধ ও উদ্ভাবনের পুনর্জাগরণ ঘটানো হবে। সর্বশেষ ‘ইন্সপায়রেশন ফেজ’ (২০৪৩-৪৬)-এর মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি অনুপ্রেরণার প্রতিষ্ঠান হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করা হবে।
এই মহাপরিকল্পনার ভিত্তি ১১টি কৌশলগত স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এগুলো হলো: নেতৃত্ব বিকাশ, গবেষণা ও উদ্ভাবন, শিক্ষা আধুনিকায়ন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকার-শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা বৃদ্ধি, সক্ষমতা বৃদ্ধি, সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক উৎকর্ষ সাধন, নৈতিক ও মানবিক ক্যাম্পাস সংস্কৃতি তৈরি, অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ এবং জাতিগত ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ। উপাচার্য জোর দিয়ে বলেন, এই পরিকল্পনা বিস্তৃত গবেষণা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী-অ্যালামনাই-শিল্প খাত ও নীতিনির্ধারকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাস্তবভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়েছে।
উপাচার্য আরও বলেন, এই পরিকল্পনা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে যেখানে গবেষণা হবে কেন্দ্রীয় শক্তি, শিক্ষা হবে ভবিষ্যৎমুখী ও যুগোপযোগী, প্রশাসন হবে দক্ষ ও স্বচ্ছ এবং উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান কিছু সীমাবদ্ধতা ও চ্যালেঞ্জের কথাও উল্লেখ করেন। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসন-সুবিধায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি, একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা ও পাঠদানের জন্য শ্রেণিকক্ষের পর্যাপ্ততা ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, গবেষণা কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব এবং গবেষণাগার ও অন্যান্য ল্যাব-সুবিধার মান ও পরিসর উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বিদ্যমান এসব সমস্যা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অগ্রগতিকে ব্যাহত করছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আর্থিক সংস্থান নিশ্চিত করতে উপাচার্য অধ্যাপক ওবায়দুল ইসলাম অ্যালামনাইদের সম্মিলিত সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এক হাজার কোটি টাকার একটি গবেষণা তহবিল এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে আরও এক হাজার কোটি টাকার পৃথক একটি তহবিল গঠনের আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। উপাচার্য বলেন, বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে অ্যালামনাইদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাইদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা আরও সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে তিনি তাদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান।
সিনেট সভায় উপাচার্য ছাড়াও সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক আবদুস সালাম, সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) আলমোজাদ্দেদী আলফেছানি, কোষাধ্যক্ষ এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনসী শামস উদ্দিন আহম্মদসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। সরকারের পক্ষে সিনেট সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন, এ কে এম ফজলুল হক মিলন, কামরুজ্জামান রতন ও আমিরুল ইসলাম খানও সভায় উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ হাজার ৩৩ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করা হলেও, সেই বাজেটে ইউজিসির পক্ষ থেকে গবেষণার জন্য কোনো বরাদ্দ ছিল না, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমের জন্য তহবিল গঠনের প্রয়োজনীয়তাকে আরও জোরালো করে তুলেছে।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে