চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার লুধুয়া গ্রামের জহিরুল ইসলাম পাটোয়ারী (৪০) এর কাছে গত শনিবার রাতের অন্ধকার নেমে এসেছিল এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন হয়ে। চোখের সামনেই দাউ দাউ করে পুড়তে দেখেছেন তার ১৭ বছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা একমাত্র অবলম্বন ‘জহির টেলিকম’ নামের দোকানটি। অগ্নিকাণ্ডের বিভীষিকা কেড়ে নিয়েছে তার সর্বস্ব, আর রেখে গেছে এক বুক দীর্ঘশ্বাস ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হাতছানি। “ধারকর্জ কইরা ১৭ বছর আগে এই দোকানডা দিছিলাম। এই দোকানের আয়েই সংসার চলত, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচও হইত। গত রাইতে চোখের সামনে দোকানডা পুড়ল। এহন সংসার চলব ক্যামনে, ছেলেমেয়েদের পড়ালেখাইবা ক্যামনে করামু!” রোববার সকালে কান্নাভেজা কণ্ঠে এভাবেই নিজের অসহায়ত্বের কথা জানাচ্ছিলেন তিনি।
জহিরুল ইসলাম জানান, ১৭ বছর আগে ব্যাংকঋণ ও ধারদেনা করে তিনি এই দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ছোট পরিসরে শুরু হলেও, কঠোর পরিশ্রম আর সততার মধ্য দিয়ে তিনি এটিকে গ্রামের একটি পরিচিত দোকানে পরিণত করেন। তার দোকানে পেট্রল, ডিজেল, অকটেন, চাল-ডাল, চা-পাতাসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি হতো। এই দোকানের আয় দিয়েই শুধু তার পাঁচ সদস্যের সংসারই চলত না, বরং ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং দুই সন্তানের লেখাপড়ার খরচও মেটানো হতো। তার এক ছেলে স্থানীয় মাদ্রাসায় এবং একমাত্র মেয়ে স্থানীয় একটি উচ্চবিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। এই দোকানটি ছিল তাদের ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা।
গত শনিবার রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে দোকান বন্ধ করে জহিরুল ইসলাম বাড়িতে যান। সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু গভীর রাতে, আনুমানিক রাত দুইটার দিকে, আকস্মিক অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে দেখেন, তার স্বপ্নের দোকানটি দাউ দাউ করে জ্বলছে। চোখের সামনেই পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তার ১৭ বছরের শ্রম ও স্বপ্ন। স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে দোকানের ভেতরের পেট্রল, ডিজেল, অকটেনসহ যাবতীয় মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। শুধুমাত্র দোকানের কাঠামো ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।
জহিরুল ইসলামের দাবি, এই অগ্নিকাণ্ডে তার প্রায় ছয় লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। কীভাবে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে, তা তিনি নিশ্চিত নন, তবে শত্রুতাবশত কেউ আগুন লাগিয়ে থাকতে পারে বলেও তার সন্দেহ। এই বিপুল ক্ষতির মুখে তিনি এখন সম্পূর্ণ দিশেহারা। সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, তা যেন এক নিমিষেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। “দোকানের লগে লগে আমার কপালডাও পুড়ছে। এহন সামনে শুধু অন্ধকারই দেখতাছি,” আক্ষেপ নিয়ে বলেন জহিরুল। তার এই মন্তব্য কেবল তার ব্যক্তিগত শোক নয়, বরং এমন অসংখ্য ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তার প্রতিনিধি, যারা অপ্রত্যাশিত দুর্যোগে সবকিছু হারান।
জহিরুল ইসলামের ভাতিজা পারভেজ পাটোয়ারী জানান, তার চাচা অনেক কষ্ট করে এই দোকানটি গড়ে তুলেছিলেন এবং ব্যবসাটিও বেশ ভালো চলছিল। এই আগুনে সব পুড়ে যাওয়ায় তিনি এখন প্রায় সর্বস্বান্ত। স্থানীয় প্রশাসন জহিরুল ইসলামের পাশে দাঁড়িয়েছে। মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম (মনি) জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত দোকানিকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতে এবং তার পাশে দাঁড়াতে উপজেলা প্রশাসন আন্তরিকভাবে চেষ্টা করবে।
তবে জহিরুল ইসলামের সামনে এখন এক কঠিন পথ। কিভাবে তিনি আবার ঘুরে দাঁড়াবেন, কিভাবে তার পরিবারের ভরণপোষণ করবেন এবং সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাবেন, সে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন। স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে হয়তো এই স্বপ্নভঙ্গের বেদনা থেকে তিনি আবারও নতুন করে শুরু করার সাহস পাবেন।
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে