Related Articles
মতামত /মো. হুমায়ুন কবির
ভোলা বাংলাদেশের একটি অন্যতম সম্ভাবনাময় জেলা, অথচ বাস্তবতায় এটি আজও যেন দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। চারদিকে নদীবেষ্টিত এই অঞ্চলকে যোগাযোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের “ভৌগোলিক বন্দিত্ব” বহন করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা থেকে মুক্তির সবচেয়ে কার্যকর উপায়— ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মাণ।
এই সেতুর প্রয়োজনীয়তা কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। এটি আসলে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জীবনমান পরিবর্তনের একটি কৌশলগত উদ্যোগ। প্রতিদিন প্রায় ২২ লাখ মানুষ লঞ্চ, স্পিডবোট ও ফেরির ওপর নির্ভর করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করে। বৈরী আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা কিংবা নদীর উত্তাল স্রোত—সব মিলিয়ে এই নির্ভরতা অনেক সময়ই ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক চিত্রটি দেখা যায় স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে। গুরুতর অসুস্থ রোগীকে সময়মতো বরিশালে বা ঢাকায় পৌঁছাতে না পারায় অনেক পরিবার আজও সন্তানের, বাবার, মায়ের প্রাণ হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছে। একটি সেতু হয়তো অলৌকিক কিছু নয়, কিন্তু এটি “সময়” কিনে দিতে পারে, আর চিকিৎসাবিজ্ঞানে সময়ই জীবন।
অর্থনীতির দিক থেকেও ভোলার সম্ভাবনা আজ অব্যবহৃত। তরমুজ, ধান, মাছ, দুধ, লবণ—এই অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য সময়মতো বাজারে না পৌঁছানোর কারণে কৃষক ন্যায্য দাম পান না। সেতু হলে পরিবহণ খরচ কমবে, সংরক্ষণকাল বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে। প্রশ্ন হলো— আমরা কি এই সম্ভাবনাকে আর অবহেলায় নষ্ট হতে দেব?
শুধু অর্থনীতি নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাও এই অবকাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। আজ যারা নিয়মিত লঞ্চের সময়সূচির ওপর নির্ভর করে ক্লাসে পৌঁছায়, পরীক্ষার হলে উপস্থিত হয়— তাদের জন্য প্রতিটি যাত্রাই এক ধরনের অনিশ্চয়তার গল্প। একটি সেতু সেই অনিশ্চয়তাকে অনেকটাই দূর করতে পারে।
পর্যটনের ক্ষেত্রেও ভোলার সম্ভাবনা বিশাল। অথচ যোগাযোগ প্রতিবন্ধকতার কারণে এই খাতটি এখনও বিকশিত হয়নি। লালমোহন, চরফ্যাশন বা মনপুরার মতো এলাকাগুলো আজও শুধুই স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো— ভোলা–বরিশাল সেতু একটি আঞ্চলিক প্রকল্প নয়; এটি একটি জাতীয় স্বার্থের বিষয়। পদ্মা সেতু যেমন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভাগ্য বদলের পথ তৈরি করেছে, তেমনি ভোলা–বরিশাল সেতুও দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতিতে এগিয়ে নিতে পারে।
আজ প্রশ্ন একটাই— আর কতদিন ভোলার মানুষকে নদীর কাছে জীবনযুদ্ধে নামতে হবে?
এই সেতু এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি সময়ের দাবি। সিদ্ধান্ত এখন নীতিনির্ধারকদের।
মো. হুমায়ুন কবির
লেখক ও বিশ্লেষক
দেশনেত্র দৃষ্টি ছাড়িয়ে